নিউজ ডেস্ক: সন্ধ্যে প্রায় ঘনিয়ে এসেছে | আলো আঁধারিতে অন্যান্য দিনের মতোই সদা ব্যস্ত গোঘাট থানার অন্তর্গত খাটুল বাসস্ট্যান্ড অঞ্চল। বিষ্ণুপুরগামী একটি যাত্রীবাহী বাস স্ট্যান্ডে পৌঁছাতেই হঠাৎ যেন দৃশ্যটা বদলে গেল। বাসের মধ্যে থেকে কেউ একজন চিৎকার করে বলে উঠলেন "চোর চোর" । হুরমুড়িয়ে নামতে থাকা যাত্রীদের মধ্য থেকে একজন আগ্নেয়াস্ত্র বার করার চেষ্টা করতেই উপস্থিত খাটুল বাজারের ব্যবসায়ীরা, ও ভদ্রেশ্বর থানার সাব ইন্সপেক্টর আসানুল হক ধরে ফেললেন সেই আততায়িকে।
কিন্তু ততক্ষণে ফাঁকে গোলে বাসের পিছনের দরজা দিয়ে চম্পট দিয়েছে অন্য দুই দুষ্কৃতি। উঠে পড়েছে উল্টো দিকে আরামবাগগামী অন্য একটি বাসে। কিন্তু তা নজর এরায়নি উপস্থিত যাত্রীদের । তাই সেই বাস থেকে নেমে আততায়ীরা দুইজন দৌড়াতে শুরু করে দিলেন ধান ক্ষেতের মধ্য দিয়ে । সঙ্গে একটি ঢাউস ব্যাগ এবং পিঠে ব্যাকপ্যাক। প্রথম আততায়ীকে ততক্ষণে ব্যবসায়ী সমিতির জিম্মায় রেখে এই দুইজনের পিছু নিলেন সিভিক ভলেন্টিয়ারেরা । মাঠের আল এর মধ্য দিয়ে চোর পুলিশ খেলা চলল কিছুক্ষণ। শেষ পর্যন্ত গ্রামবাসীদের হাতে ধরা পড়লেন দুজনে। ব্যাগ খুলতেই উপস্থিত সকলের চক্ষু চরক গাছ। ব্যাগের মধ্যে থেকে বেরিয়ে এলো তালতাল সোনা ও বেশ কয়েকটি আগ্নেয়াস্ত্র। এরমধ্যে একজন আততায়ী কোন এক ফাঁকে দৌড় লাগিয়েছিলেন খাটুল রেনবো ক্লাবের দিকে কিন্তু ততক্ষণে নজর পড়ে যায় খাটুল গ্রামের সিভিক ভলেন্টিয়ার প্রসেনজিৎ গড়াইয়ের চোখে। কিন্তু সেই দৌড়ও খুব একটা দীর্ঘস্থায়ী হলো না। রেনবো ক্লাবের ছেলেরা এবং উপস্থিত ব্যবসায়ীদের সাহায্যে ধরা পরল চতুর্থ দুষ্কৃতী।
আপনারা ভাবছেন হয়তো কোন হিন্দি সিনেমার প্লট। "না" । হিন্দি সিনেমার প্লট বা পর্দার কোন হিরোর গল্প নয়। গত ১৫ সেপ্টেম্বর ডানকুনি থানার অন্তর্গত সেনকো গোল্ড জুয়েলার্স যে ডাকাতির ঘটনা ঘটেছিল সেই ঘটনার অভিযুক্ত চার অপরাধীর ধরা পড়ার মুহূর্তের অংশবিশেষ। সেদিন সন্ধ্যাবেলায় অসম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে ডাকাতদের পিছু ধাওয়া করেছিলেন, গোঘাট থানার দুই সিভিক ভলেন্টিয়ার সুভাষ ও প্রসেনজিৎ । তাদেরকে সমস্ত সাহায্য করেছিলেন খাটুল ব্যবসায়ী সদস্যরা এবং সেখানে উপস্থিত খাটুল বাসস্ট্যান্ডের যাত্রীরা। বাস থেকে চিৎকার করে সবাইকে সতর্ক করা আর প্রথম আততায়ীকে ধরে তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তার আর সাহসের পরিচয় দিয়েছিলেন ভদ্রেশ্বর থানার পি এস আই আসানুল হক।
সেদিন সন্ধ্যাবেলা খাটুল ব্যবসায়ী সমিতির সদস্যগণ সশস্ত্র আততায়ীদের বিরুদ্ধে এই প্রতিরোধ গড়ে না তুললে এই ডাকাতির কিনারা করা সম্ভব হতো না এত তাড়াতাড়ি।খাটুল বাজারে উপস্থিত সিভিক ভলান্টিয়ার, পি এস আই আশানুল হক ও ব্যবসায়ী সমিতির সদস্যগণের সাথেই যাদের নাম আরো উল্লেখ করতে হয় তারা হলেন-- শ্রী অভিষেক মন্ডল- সাবডিভিশনাল পুলিশ অফিসার, আই সি আরামবাগ, বাঁকুড়া জেলার ওসি কোতুলপুর ও ওসি জয়পুর,যারা প্রত্যেকে খবর পেয়ে সাথে সাথে পৌঁছে যান খাটুল বাজারে। এছাড়াও উল্লেখ করতে হয় চন্ডীতলা থানার সাব-ইন্সপেক্টর নির্মল কর এবং সিঙ্গুর থানার ভিলেজ পুলিশ রূপচাঁদ ডাকালের নাম যাদের তারা খেয়েই ডাকাত দলটি আরামবাগের পথ নিয়েছিল।
যে সমস্ত পুলিশ কর্মী ও খাটুল বাজারের সাধারণ যাত্রী ও ব্যবসায়ী সমিতির সদস্যগণ সেদিন নিজেদের জীবন বাজী রেখে আগ্নেয়াস্ত্র সমেত এই চার দুষ্কৃতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলে তাদের ধরে ফেলেছিলেন এবং সেনকো গোল্ড এর সমস্ত চুরি যাওয়া সোনা পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছিলেন তাদেরকে জানাই কুর্নিশ।
আজ একটি ছোট্ট অনুষ্ঠানে হুগলি গ্রামীণ জেলার পুলিশ সুপার শ্রী আমনদীপ, আইপিএস পুলিশ কর্মীদের হাতে তাদের সাহসিকতাকে সম্মান জানিয়ে তুলে দিলেন প্রশংসাপত্র ও ছোট্ট একটি উপহার। অন্য একটি অনুষ্ঠানে গোঘাট থানায় উপস্থিত ছিলেন খাটুল ব্যবসায়ী সমিতির সদস্যগণ। হুগলি গ্রামীণ জেলার পুলিশ সুপারের তরফ থেকে তাদের হাতে প্রশংসাপত্র তুলে দেন এসডিপিও আরামবাগ।